ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত হলো ‘যুব শান্তি মেলা’
মোঃ আল মাশরাফি, স্টাফ রিপোর্টার:
আজ ২০ আগস্ট ২০২৬: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও এর ফলে সৃষ্ট সামাজিক সংকট মোকাবিলায় তরুণদের সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব ও শান্তিপূর্ণ সমাধান তুলে ধরতে ঝালকাঠিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘যুব শান্তি মেলা’।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমি, ঝালকাঠিতে এ মেলার আয়োজন করা হয়। ‘Youth Climate Action for Peace’ উদ্যোগের সমাপনী আয়োজন হিসেবে অনুষ্ঠিত মেলায় জেলার পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের Youth Climate Club-এর ১৫০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তারা জলবায়ু পরিবর্তন ও এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে কাজ করে বিভিন্ন সৃজনশীল সমাধান ও উদ্যোগ উপস্থাপন করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও জীবিকাগত সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ ক্রমেই বাড়ছে। এসব সংকট মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা ও সৃজনশীল বিকাশেও প্রভাব ফেলছে। এ বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের শিকার হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের সমাধানদাতা ও জলবায়ু নেতা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়।
মেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিভিল সার্জন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি), ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা। এছাড়া জেলার ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, যুব ও জলবায়ুকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার তিন শতাধিক মানুষ মেলায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান শুভ।
মেলায় পাঁচটি Youth Climate Club-এর শিক্ষার্থীরা তাদের তৈরি বিভিন্ন মডেল, দেয়ালিকা, ভিডিও, পথনাটক ও অন্যান্য সৃজনশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সামাজিক সমস্যা এবং এসব সমস্যা মোকাবিলায় তাদের প্রস্তাবিত সমাধান তুলে ধরে। অতিথিরা শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন এবং তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইয়ুথনেট গ্লোবালের এ ধরনের উদ্যোগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা থাকবে। ঝালকাঠির প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে Youth Climate Club গড়ে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা জলবায়ু সহনশীল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে চাই।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিভিল সার্জন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পরিবেশের ওপর নয়, মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ওপরও পড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পরিবেশ সচেতনতা ও জলবায়ুবান্ধব জীবনধারা গড়ে তোলা জরুরি। আজকের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগগুলো আমাদের আশাবাদী করে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কাওছার হোসেন বলেন, “তরুণদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণ তৈরি এবং সামাজিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে তাদের সম্পৃক্ত করার এ উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। শিক্ষার্থীরা যে সৃজনশীল চিন্তা ও সমাধান তুলে ধরেছে, তা ভবিষ্যৎ জলবায়ু কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।”
অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান শুভ বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি শিক্ষা, জীবিকা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। আমরা চাই, তরুণরা সমস্যার দর্শক না হয়ে সমাধানের অংশীদার হোক। আজকের যুব শান্তি মেলা সেই লক্ষ্যেই তরুণদের কণ্ঠ, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। আমরা চাই ঝালকাঠির প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে Youth Climate Club গড়ে উঠুক এবং তরুণদের নেতৃত্বে জলবায়ু ও শান্তির জন্য একটি শক্তিশালী আন্দোলন তৈরি হোক।”
বাংলাদেশ থেকে Changemaker Youth Grant Awardee সাজিদ মাহামুদ বলেন, “আজকের এই যুব শান্তি মেলা আমাদের উদ্যোগের সমাপ্তি নয়, এটি আমাদের নতুন কার্যক্রমের শুরুর অনুপ্রেরণা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা যে জলবায়ু কার্যক্রমের সূচনা করেছি, তা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে। এমন একটি উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণদের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত।”
বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; তরুণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি সংগঠনসহ সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট উদ্যোগ ভবিষ্যতে বড় সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আয়োজকরা জানান, ‘যুব শান্তি মেলা’ শুধু একটি প্রদর্শনী নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল সংকট মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসার একটি প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে সংযোগ তৈরির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জলবায়ু কার্যক্রমে তরুণদের সম্পৃক্ততার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, ‘Youth Climate Action for Peace’ উদ্যোগের পরবর্তী ধাপে এর অভিজ্ঞতা, ফলাফল এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল সমাধান ও কণ্ঠস্বর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২২ আগস্ট আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের তরুণদের এ উদ্যোগ এবং জলবায়ু বিষয়ে তাদের ভাবনা তুলে ধরা হবে।


আপনার মতামত লিখুন