প্রধান প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রভাবশালী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকালে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক সামাজিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করা খালেদা জিয়া শৈশবে ছিলেন শান্ত ও পরিবারমুখী। পরবর্তীতে দিনাজপুরে বেড়ে ওঠেন। ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন। স্বাধীনতার পরে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর অনুপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে।
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হলে বিএনপির নেতৃত্বে এগিয়ে আসেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে তিনি দলটির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠেন। দেশব্যাপী বিক্ষোভ, হরতাল, লংমার্চ, গণসমাবেশে তিনি নেতৃত্ব দেন। একাধিকবার তাকে গ্রেফতার ও গৃহবন্দি অবস্থায় রাখতে হয়। তবুও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সক্রিয় ও সাহসী।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রে অগ্রগতি লাভ করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি ও অর্থনীতিতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আরও দু’বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বের প্রভাব বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে অনুভূত হয়।
২০০৮ সালের পর দুর্নীতির অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের হয় এবং তিনি দণ্ডিত হন। বহু বছর তিনি কারাবন্দি ছিলেন। বিএনপির দাবি ছিল এসব রাজনৈতিক প্রতিহিংসা; সরকার বলেছিল এগুলো ছিল আইনি প্রক্রিয়া। কারাবন্দি জীবনেই তাঁর শারীরিক অবস্থা অবনতি ঘটতে শুরু করে। পরে মানবিক বিবেচনায় তাঁকে বাসায় চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লিভার, কিডনি ও শ্বাসযন্ত্রজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন।
গত কয়েক মাস ধরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত ২৩ নভেম্বর ২০২৫ তাঁকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দেশি বিদেশী চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।
আজ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সকাল ৬ টায় চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা দেশের রাজনীতির প্রতিটি বাঁকে তাঁর উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবন দেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ১:৩৮ অপরাহ্ণ