তৃতীয় পর্ব
চন্দন কুমার লাহিড়ী
”তিস্তা ভাঙে, ভরা যৌবনে। একূল ভেঙে পড়ে, আবার ও কূলে গড়ে তোলে নতুন স্বপ্ন কখনো তপ্ত কখনো বা নরম বালুময়। জনজীবন হারায় না, সে শুধু স্থান বদলায়। নদীর পাড় আঁকড়ে ধরে মানুষ বাঁচে, স্বপ্ন দেখে, বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এখানকার মানুষের মন পাল্টায়, গড়ে ওঠে নতুন মন। ‘তিস্তা পাড়ের মানুষের মন’ নিয়ে লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ”
নদীর সাথে মানুষের জীবন। তার সাথে তার মন । এ এক অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ। আদীকাল থেকেই এনিয়ে নানাবিধ সংস্কার, রীতি, গল্প, আলোচনা অব্যাহত আছে। নদীতে কিংবা জলসম্ভারে দেবী গঙ্গাঁর বাস করে এমন বিশ্বাসের জায়গা থেকে সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষ জলে পা দেবার আগে প্রনাম করে খানিকটা জল মাথায় দেন, তারপরে জলে পা দেন । ধারনাটি যতটা ধর্মীয় তার থেকে বেশি প্রকৃতিবাদী। জলদূষন রক্ষায় এটি একটি অনন্য প্রয়াস। যদিও ধারনাটি ক্রমশ বিলিন হবার পথে। কিন্তু নদীর সাথে প্রকৃতি এবং মানুষের জীবন প্রতিদিন অপরিহার্য হয়ে উটছে।
পৌরাণিক লোকশ্রুতিতে নদীকে দেখা হয় জীবন্ত সত্তা হিসেবে—কখনও দেবী, কখনও জননী, কখনও আবার অভিশাপবহনকারী শক্তি। প্রাচীন বিশ্বাসে নদী স্বর্গ থেকে নেমে আসা পবিত্র প্রবাহ, যা মানুষের পাপ ধুয়ে দেয়, ভূমিকে উর্বর করে এবং সভ্যতার জন্ম দেয়। তাই নদীর উৎসকে ধরা হয় দেবলোকের সঙ্গে পৃথিবীর সংযোগস্থল।
একটি লোককথায় আছে, তিস্তা একসময় প্রেমে পড়েছিলেন ব্রহ্মপুত্রের। কিন্তু সেই প্রেম অপূর্ণ থেকে যায়। অভিমানে, দুঃখে তিস্তা নিজের পথ বদলে নেন—এই কারণেই নাকি তাঁর প্রবাহ এত অনিয়মিত, কখনও শান্ত আবার কখনও ভয়ঙ্কর। মানুষের চোখে যা ভাঙন ও সর্বনাশ, লোকবিশ্বাসে তা তিস্তার অভিমানী দীর্ঘশ্বাস। আরেক পৌরাণিক কাহিনিতে তিস্তাকে উর্বরতার দেবী হিসেবে দেখা হয়। তাঁর জল যেখানে পৌঁছায়, সেখানেই নাকি শস্য হাসে, জনপদ গড়ে ওঠে। তাই নদীপাড়ের মানুষ তিস্তাকে মা বলে ডাকে—“তিস্তা মা”। ভাঙনে ঘর হারালেও তাঁকে অভিশাপ দেয় না কেউ; বরং বলে, মা রাগ করেছেন, আবার ফিরেও দেবেন। মায়ের মন বলে কথা।
অন্যদিকে পৌরাণিক লোকশ্রুতিতে তিস্তাকে বর্ননা করা হয়েছে এভাবে যে, একবার পার্বতী এক ভীষণ দানবের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ভয়ংকর যুদ্ধ করতে করতে সেই দানব প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। ওই সময় দানব মহাদেবের শরণাপন্ন হন তখন মহাদেব দানবের কাতর আহ্বানে তুষ্ঠ হয়ে পার্বতীকে জল প্রদান করবার অনুরোধ জানান। মহাদেবের অনুরোধে সাড়া দিয়ে পার্বতী নিজ বক্ষ থেকে তিনটি ধারা নির্গত করেন। পৌরাণিক এই তিন ধারা থেকেই ত্রিস্রোতা তথা তিস্তার সৃষ্টি। পার্বতীর এই মাতৃহ্রদয়/মন নিজ বক্ষ চিড়ে তৃষ্ণার্ত দানবের জন্য জলধারা তেরি করেন। এ শুধু মায়ের মন বলেই সম্ভব। সুতরাং ধরে নেয়া হয় তিস্তা পাড়ের মানুষের মনও এরকমই। অদ্ভুত মায়াবী। পৌরাণিক লোকশ্রুতি অনুযায়ী মহামায়া পার্বতীর বক্ষ থেকে সৃষ্টি হওয়া তিস্তার জল অত্যন্ত পবিত্র বলেই এতদ্ অঞ্চলে মানা হয়। তিস্তাকে কেন্দ্র করে নানাবিধ সংস্কার আচার আজ সমানভাবে পালন করা হয়ে থাকে।
নানাবিধ নাম এই তিস্তার। ঋক্-বৈদিক যুগে তিস্তার প্রাচীন নাম ছিল ‘সদানীর’, যার অর্থ চিরপ্রবাহমান জলধারা। পরবর্তীতে কালিকা-পুরাণে নদীটির নাম পাওয়া যায় ‘ত্রিস্রোতা’—তিন ধারায় প্রবাহিত নদী হিসেবে এর পৌরাণিক পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। মধ্যযুগে, একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত কবি ভবানী দাসের ‘ময়নামতী’ পুঁথিতেও তিস্তার উল্লেখ রয়েছে, যা লোককথা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যে নদীটির উপস্থিতি প্রমাণ করে। এ ছাড়া পুরাণ ও তন্ত্রসাহিত্যে তিস্তাকে হিমালয়জাত পবিত্র নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রাচীন কামরূপ ও বরেন্দ্র অঞ্চলের জনপদ গঠনে এর ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রাচীন ভ্রমণবৃত্তান্ত ও ভূগোলগ্রন্থে তিস্তা উত্তরবঙ্গের জীবনধারার প্রধান সহায়ক নদী হিসেবে চিহ্নিত, যা তার সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রাচীনত্বকে আরও দৃঢ় করে। তিস্তা কতটা প্রাচীন এসব দেখেলে সে বিষয়ে ধারনা লাভ করা যায়। চলবে————–।
তথ্যসূত্র।
১. দ্যোতনা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনিবার্য কাগজ
৪৭ বর্ষ # প্রথম সংখ্যা # হেমন্ত-১৪৩২ # অক্টোবর-নভেম্বর ২০২৫, জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবংগ, ভারত।
২. কালিকাপূরাণ
৩. তিস্তা উইকিপিডিয়া
লেখক পরিচিতি: মুক্ত লেখক ও অধিকার কর্মী
laherichandan@gmail.com

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ । ১০:৪১ অপরাহ্ণ