উদার মানুষ মানেই বিত্তবান নয়

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬ । ১১:৪৬ অপরাহ্ণ

লেখক মো. গোলাম ফারুক মজনু

রাস্তাঘাটের টঙের দোকানে এক কাপ চায়ের বিল দেওয়া কিংবা কোনো রেস্টুরেন্টে চা-কফির দাম পরিশোধ করা, বিষয়টি আমাদের কাছে খুবই সাধারণ। কিন্তু এই সামান্য বিলের আড়ালেও কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা কিংবা নীরব আত্মত্যাগ। তাই কেউ আপনার চায়ের বিল দিলেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে তার হাতে অঢেল টাকা আছে, কিংবা টাকা খরচ করার কোনো পথ সে খুঁজে পাচ্ছে না। অনেক সময় মানুষ নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও প্রিয় মানুষটির জন্য কিছু করতে চায়। কেউ নিজের যাতায়াতের টাকা বাঁচিয়ে এক কাপ চায়ের বিল দেয়, কেউ পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ কিছুটা কমিয়ে প্রিয়জনকে আপ্যায়ন করে। বাইরে থেকে আমরা শুধু বিলটি দেখি, কিন্তু দেখি না সেই বিলের পেছনে থাকা মানুষের সামর্থ্য, সংকট কিংবা ত্যাগ। অথচ সেই সামান্য খরচটিই হয়তো তার দিনের একটি প্রয়োজনীয় ব্যয় ছিল। তারপরও প্রিয় মানুষটির মুখে হাসি দেখার জন্য সে নিজের প্রয়োজনকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যায়। ভালোবাসার এই হিসাব কোনো ক্যালকুলেটরে মাপা যায় না। এটি অনুভব করতে হয় হৃদয় দিয়ে।

আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা নিজের প্রয়োজনকে সাময়িক ভাবে পেছনে রেখে অন্যের জন্য খরচ করেন। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জীবনে এমন উদাহরণ কম নয়। অনেক ব্যবসায়ী নিজের প্রিয়জন, বড় ভাই, শুভাকাঙ্ক্ষী কিংবা সম্মানিত কোনো ব্যক্তির জন্য বিমানের টিকিট কিনে দেন, বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করেন, পরিবারের জন্য হোটেল বুক করে দেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, তার হাতে বুঝি প্রচুর টাকা আছে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় সম্পূর্ণ ভিন্ন। খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে, সেই টিকিটের টাকা তিনি ধার করেছেন, ব্যবসার মূলধন থেকে দিয়েছেন কিংবা নিজের পরিবারের কোনো প্রয়োজনীয় খরচ সাময়িক ভাবে স্থগিত রেখেছেন। তবুও তিনি তা করেছেন কোনো বাড়তি সুবিধা পাওয়ার আশায় নয়। করেছেন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। একজন মানুষ যখন নিজের সামর্থ্যের সীমা অতিক্রম করে অন্যের জন্য কিছু করেন, তখন তার সেই কাজকে শুধু অর্থের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কারণ সেখানে হয়তো টাকার চেয়ে বড় হয়ে থাকে তার অনুভূতি।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময় মানুষের উদারতাকে তার আর্থিক সক্ষমতার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলি। কেউ একবার বড় কিছু করে দিলে ধরে নিই, সে ভবিষ্যতেও একইভাবে করতে পারবে। একসময় সেই আন্তরিকতা পরিণত হয় প্রত্যাশায়, আর প্রত্যাশা থেকে জন্ম নেয় অধিকারবোধ। যে মানুষটি একদিন আনন্দের সঙ্গে আপনার জন্য কিছু করেছিলেন, পরদিন তার সামর্থ্য না থাকলে তাকেই হয়তো স্বার্থপর, পরিবর্তিত কিংবা অকৃতজ্ঞ মনে হতে থাকে। অথচ আমরা একবারও ভাবি না, যে মানুষটি আগের দিন আপনার জন্য খরচ করেছিলেন, সেটি হয়তো তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত ছিল। হয়তো নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়েই তিনি আপনাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাই কারও একদিনের উদারতাকে তার স্থায়ী সামর্থ্য হিসেবে ধরে নেওয়া শুধু অন্যায় নয়, সম্পর্কের প্রতিও এক ধরনের অবিচার।

সমাজে আরও এক শ্রেণির মানুষ আছেন, যারা অন্যের সরলতা, ভদ্রতা ও আন্তরিকতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন। তারা কখনো জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সামাজিক পরিচয় কিংবা সম্পর্কের আবরণে মানুষের কাছাকাছি আসেন। কথাবার্তায় থাকে প্রজ্ঞার ঝলকানি, আচরণে থাকে অভিজ্ঞতার ছাপ। কিন্তু সুযোগ পেলেই অন্যের আবেগ, বিশ্বাস কিংবা আতিথেয়তাকে নিজের সুবিধার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। কেউ একবার আপ্যায়ন করলে বারবার প্রত্যাশা করেন, কেউ একবার সহযোগিতা করলে সেটিকে ভবিষ্যতের অধিকার মনে করেন। অথচ তারা ভুলে যান, যে মানুষটি সহযোগিতা করছে, সে দুর্বল নয় বরং সম্পর্ককে সম্মান করেই উদার হচ্ছে। মানুষের ভালোবাসাকে সুযোগ হিসেবে দেখা এবং তার সরলতাকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা কোনো ভাবেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হতে পারে না।

এ ধরনের মানসিকতা থেকে আমাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। একজন মানুষের ভালো ব্যবহার, উদারতা কিংবা অতিথিপরায়ণতা তার দুর্বলতার প্রমাণ নয়। বরং অনেক সময় সেটিই তার সবচেয়ে বড় মানবিক শক্তি। যে মানুষ নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও অন্যের পাশে দাঁড়ায়, তাকে দুর্বল ভাবা মানে তার মানবিকতাকে অপমান করা। একই সঙ্গে যারা ভালোবাসা ও সহযোগিতা পান, তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে সেই অনুভূতির মর্যাদা দেওয়ার। কারণ একজন মানুষ আপনার জন্য কিছু করছে মানেই এই নয় যে সে তা করতেই বাধ্য। সে হয়তো সম্পর্কের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নিজের ইচ্ছায় করছে। সেই ইচ্ছাকে অধিকার বানিয়ে ফেলা সম্পর্কের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়।

তাই কারও পকেট দেখে তার হৃদয়ের মূল্য নির্ধারণ করা উচিত নয়। একজন মানুষ কত টাকা খরচ করতে পারে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে কেন খরচ করছে। এক কাপ চায়ের বিল হয়তো অর্থের দিক থেকে সামান্য কিন্তু সেটি যদি আসে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকে, তবে তার মূল্য অনেক বড়। আবার একটি বিমানের টিকিট হয়তো অনেক টাকার, কিন্তু তার পেছনে যদি থাকে কেবল স্বার্থ, তবে সেই ব্যয়ের মানবিক মূল্য খুব সামান্য। অর্থের পরিমাণ কখনো মানুষের অনুভূতির গভীরতা নির্ধারণ করতে পারে না। কখনো সামান্য একটি চা হয়ে ওঠে গভীর ভালোবাসার প্রতীক, আবার কখনো বড় কোনো উপহারও হয়ে উঠতে পারে নিছক স্বার্থের লেনদেন।

সম্পর্কের সৌন্দর্য টাকার অঙ্কে নয়, অনুভূতির গভীরতায়। কেউ আপনার জন্য নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কিছু করলে তার সামর্থ্যকে নয়, তার আন্তরিকতাকে সম্মান করুন। আর আপনি যদি কারও কাছ থেকে ভালোবাসা, সহযোগিতা কিংবা আতিথেয়তা পান, সেটিকে নিজের অধিকার মনে করবেন না। মনে রাখবেন, মানুষের দেওয়া প্রতিটি সহায়তার পেছনে হয়তো এমন কোনো ত্যাগ থাকে, যার কথা সে কখনো আপনাকে জানায়নি। হয়তো যে মানুষটি হাসিমুখে আপনার জন্য বিল পরিশোধ করছে, সেই মানুষটিই নিজের প্রয়োজনের সময় নীরবে হিসাব কষছে। হয়তো যে ব্যবসায়ী আপনার জন্য বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করছেন, তিনি নিজের পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে অনেক কিছু ত্যাগ করছেন। তার সেই ত্যাগকে সম্মান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

উদার মানুষ মানেই বিত্তবান নয়। অনেক সময় সবচেয়ে উদার মানুষটিই হয়তো সবচেয়ে বেশি হিসাব করে চলেন, শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য। নিজের প্রয়োজনের সঙ্গে আপস করেই তিনি অন্যের প্রয়োজন পূরণ করেন, নিজের কষ্ট আড়াল করেই অন্যের মুখে হাসি ফোটান। তার কাছে ভালোবাসার মূল্য টাকার অঙ্কে নয়, সম্পর্কের মর্যাদায়। তাই এমন মানুষকে তার উদারতার কারণে আরও বেশি খরচ করতে বাধ্য করা নয়, বরং তার আন্তরিকতার মর্যাদা দেওয়া উচিত। কারণ ভালোবাসা তখনই সুন্দর, যখন সেখানে প্রত্যাশার চেয়ে কৃতজ্ঞতা বেশি থাকে। অধিকারবোধের চেয়ে সম্মান বেশি থাকে।

আমাদের মনে রাখা দরকার, মানুষের পকেটের হিসাব নেওয়া সহজ, কিন্তু তার হৃদয়ের হিসাব বোঝা কঠিন। তাই যে মানুষটি ভালোবাসা থেকে আপনার জন্য এক কাপ চায়ের বিল দেয়, তার কাছে কত টাকা আছে সেটি নয়। আপনার জন্য সে কতটা আন্তরিক, সেটিই দেখুন। যে মানুষটি নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে আপনার জন্য একটি টিকিটের ব্যবস্থা করে, তার সম্পদ নয় তার ত্যাগটুকু মনে রাখুন। আর যারা মানুষের সরলতা ও ভালোবাসাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন, তাদের থেকেও দূরে থাকা উচিত। কারণ অর্থ দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায়, কিন্তু একজন মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আত্মত্যাগ কখনোই কেনা যায় না। সম্পর্ক টিকে থাকে অর্থের জোরে নয়, টিকে থাকে পারস্পরিক সম্মান, কৃতজ্ঞতা, বিশ্বাস ও মানবিকতার ওপর।

সম্পাদক : মো: শহিদুল ইসলাম । বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৮/১, এভিনিউ ১, ব্লক - সি, চন্দ্রিমা মডেল টাউন, মোহাম্মদপুর, ঢাকা - ১২১৭। মোবাইলঃ +৮৮-০১৩১৪-০০৮০৭৭

প্রিন্ট করুন