বানারীপাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইন্টারনেট বিলের ১০ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি:
বরিশালের বানারীপাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইন্টারনেট বিলের বরাদ্দ থেকে ১০ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অধিদপ্তরের ‘ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন (ইডিসি)’ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়গুলোতে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার নামে ভুয়া বা অতিরিক্ত সময়ের বিল-ভাউচার প্রস্তুত করে এ অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের তীর স্থানীয় একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদার নুর আলম সিদ্দিকসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দিকে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার নুর আলম সিদ্দিক। সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা ও আইসিটি কর্মকর্তারাও অভিযোগের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ইডিসি প্রকল্পের আওতায় বানারীপাড়া উপজেলার প্রায় শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা তাঁর প্রতিনিধি এবং ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘স্কাইভিউ অনলাইন লিমিটেড’-এর ঠিকাদার নুর আলম সিদ্দিকের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদিত হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যালয়গুলোতে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার পাশাপাশি প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা করে ইন্টারনেট বিল রিচার্জ করার কথা ছিল।
ভুক্তভোগী শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হলেও তা দীর্ঘদিন চালু থাকেনি। কোথাও সংযোগ দেওয়া হয়নি, আবার কোথাও কয়েক মাস সেবা দেওয়ার পর রিচার্জ না করায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিজেদের অর্থে ইন্টারনেট বিল পরিশোধ করতে হয়েছে।
বিষয়টি উপজেলা সমন্বয় সভায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা মৌখিকভাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খগোপতি রায়কে অবহিত করলেও কার্যকর কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ শিক্ষকদের।
অভিযোগ রয়েছে, যেসব বিদ্যালয় নিজেদের অর্থে কয়েক মাসের ইন্টারনেট বিল পরিশোধ করেছে, তারা ওই সময়ের বিলের ভাউচার প্রস্তুতের উদ্যোগ নিলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের পক্ষ থেকে উপজেলা আইসিটি অফিসের অফিস সহায়ক মো. সবুজ ও ইডিসি প্রকল্পের ফিল্ড আইটি টেকনিশিয়ান আব্দুর রহমান রাজুর মাধ্যমে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে ৩-৪ মাসের পরিবর্তে ১১ মাসের বিল-ভাউচার ও প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
শিক্ষকদের অভিযোগ, তাদের বলা হয়েছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই বিদ্যালয়গুলো এসব বিলের টাকা পেয়ে যাবে। পরে ওই ভাউচারের ভিত্তিতে চূড়ান্ত বিল প্রস্তুত করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং চেকের মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অর্থ উত্তোলন করলেও সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোকে ইন্টারনেট সেবা বাবদ বকেয়া বিলের টাকা কিংবা অর্থ প্রাপ্তির কোনো স্বীকৃতিপত্র দেওয়া হয়নি।
এ ঘটনায় উপজেলা আইসিটি অফিসের দুই কর্মচারী সবুজ ও আব্দুর রহমান রাজুর বিরুদ্ধে ঠিকাদারকে সহযোগিতা করার অভিযোগও উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা করে বিদ্যালয়গুলো থেকে বিল-ভাউচার সংগ্রহ এবং অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।
তবে এ বিষয়ে উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা হাফিজ আল আসাদ বলেন, তিনি এ ধরনের কোনো অনিয়মের বিষয়ে জানেন না।
বানারীপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুল আলম মিঠু অভিযোগ করে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা হাফিজ আল আসাদের কাছে গেলে তিনি ঠিকাদার নুর আলমের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে তাঁর কার্যালয়ে বসে বিষয়টি ‘সমাধান’ করার জন্য এক লাখ টাকা নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন মনিরুল আলম। তবে তিনি ওই প্রস্তাবে রাজি হননি বলে জানান।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা হাফিজ আল আসাদ বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খগোপতি রায়ের কাছে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা না করে চূড়ান্ত বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর দিয়ে বিল পাশ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিল-ভাউচার পাওয়ার পর তা পাশ করে দেওয়া তাঁর নিয়মিত দায়িত্বের অংশ।
তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া তাঁর করার কিছু নেই। একই সঙ্গে তিনি জানান, এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার নুর আলম সিদ্দিক বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষর করা বিল-ভাউচারের ভিত্তিতেই তিনি তাঁর পাওনা টাকা উত্তোলন করেছেন। কোনো অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
এদিকে অভিযোগের ঘটনায় সরকারি অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
তাদের দাবি, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রকৃত ইন্টারনেট সংযোগ, সেবার মেয়াদ, রিচার্জের তথ্য, বিল-ভাউচার, প্রত্যয়নপত্র ও চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা অর্থের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে ঠিকাদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প যদি অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে এর সুফল থেকে বঞ্চিত হবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাই দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি উঠেছে।


আপনার মতামত লিখুন