বুকাবুনিয়া ইউপি নির্বাচনে জামায়াতের তিন প্রার্থী আলোচনায়
বামনা (বরগুনা) প্রতিনিধি:
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বরগুনার বামনা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ১নং বুকাবুনিয়া ইউনিয়নে রাজনৈতিক উত্তাপ ও নির্বাচনী আমেজ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করলেও রাজপথ ও সামাজিক মাধ্যমে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম। একটি অবহেলিত ও উন্নয়নবঞ্চিত ইউনিয়নকে সমৃদ্ধ, দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত এবং ইনসাফভিত্তিক মডেল হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তিনজন হেভিওয়েট ও সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব মাঠে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
তৃণমূলের জনমত, দলীয় নেতাকর্মীদের ভাবনা এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বুকাবুনিয়া ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থিতার দৌড়ে তিনজন নেতা বর্তমানে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তাঁরা হলেন—প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও দক্ষ সংগঠক মাওলানা মাহবুবুর রহমান, সাবেক ছাত্রনেতা, তরুণ ব্যবসায়ী ও সংবাদকর্মী আবুল কালাম আজাদ এবং রাজপথের পরীক্ষিত জননেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান প্রার্থী আলহাজ্ব মো: কবির হোসেন। এই তিন প্রার্থীর নিজ নিজ অবস্থান থেকে সামাজিক পরিচিতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ত্যাগের স্বতন্ত্র ইতিহাস রয়েছে। ভোটাররা মনে করছেন, এই তিনজনের মধ্য থেকেই যে কেউ চূড়ান্ত টিকিট পেলে তিনি নির্বাচনে সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন পাবেন।
১. প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক মাওলানা মাহবুবুর রহমান:
মাওলানা মাহবুবুর রহমান বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ও প্রবীণ এক ব্যক্তিত্ব। তিনি বুকাবুনিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক সফল সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বামনা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর গুরুত্বপূর্ণ ‘দপ্তর সম্পাদক’ পদে নিষ্ঠার সাথে সাংগঠনিক দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছেন। একইসাথে তিনি আদর্শ শিক্ষক পরিষদ, বামনা উপজেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে এলাকার বহু শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। নীতি-নৈতিকতা এবং প্রজ্ঞার কারণে দলমত নির্বিশেষে বুকাবুনিয়া ইউনিয়নে তাঁর একটি পৃথক ও সুদৃঢ় ভাবমূর্তি রয়েছে।
মাওলানা মাহবুবুর রহমান যদি ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বে আসেন, তবে তিনি মূলত শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকাঠামো জোরদার করা এবং সমাজ থেকে মাদকের ভয়াবহতা দূর করে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে চান। তিনি চান ইউনিয়ন পরিষদকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করে প্রতিটি নাগরিক যেন সমান অধিকার ও বিচার সুবিধা পায় তা নিশ্চিত করতে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও নিজের প্রার্থিতা নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে মাওলানা মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে এই মাটি ও মানুষের সাথে যুক্ত আছি। সংগঠন ও সমাজের নানা দায়িত্বে থেকে সবসময় সততার সাথে মানুষের সেবা করার চেষ্টা করেছি। জামায়াতে ইসলামী একটি সুশৃঙ্খল ও গণতান্ত্রিক আদর্শের সংগঠন। দল ইতিমধ্যেই স্থানীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের সার্বিক মতামত ও পরামর্শ বিবেচনা করে আমাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও মাঠপর্যায়ে নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। আমি বর্তমানে একটি এমপিওভুক্ত উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছি। দেশের প্রচলিত নির্বাচনী আইন অনুযায়ী যদি আমার শিক্ষাকতা সম্পর্কিত কোনো আইনি জটিলতা তৈরি না হয়, তবে ১নং বুকাবুনিয়া ইউনিয়নে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ইনশাআল্লাহ আমিই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। নির্বাচিত হতে পারলে এই ইউনিয়নকে একটি শিক্ষা অনুরাগী ও নীতিভিত্তিক আদর্শ এলাকা হিসেবে গড়ে তোলাই হবে আমার মূল মিশন।”
২. তরুণ সমাজসেবক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আবুল কালাম আজাদ:
তরুণ ও উদ্দীপনাকামী প্রার্থী হিসেবে বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের রাজনীতিতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হওয়ার পাশাপাশি সংবাদ মাধ্যমে অত্যন্ত সুপরিচিত মুখ। বর্তমানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে বামনা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে। ছাত্রজীবনে তিনি দক্ষতার সাথে শিবিরের সাথী এবং পরবর্তীতে থানা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত ‘রুকন’ এবং পল্টন থানার অন্তর্ভুক্ত একটি সাংগঠনিক ইউনিটের সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। তরুণ সমাজ ও পেশাজীবীদের মাঝে তাঁর বিশেষ প্রভাব রয়েছে।
আবুল কালাম আজাদ একজন আধুনিক ও কর্মসংস্থানমুখী ইউনিয়ন গড়ার ভিশন নিয়ে সামনে এগোচ্ছেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য—তথ্যপ্রযুক্তির সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া, ইউনিয়ন পরিষদকে শতভাগ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা, তরুণ বেকার যুবকদের জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বামনা প্রেসক্লাবের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইউনিয়নের সার্বিক সমস্যাগুলো জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরে উন্নয়ন জোরদার করা।
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও নিজের প্রার্থিতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবুল কালাম আজাদ বলেন, “আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্ররাজনীতি থেকে। রাজপথের নানা চড়াই-উতরাই, ঝড়-ঝাপটা এবং প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হয়েও ইসলামী আন্দোলনের আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত হইনি। ইসলামী ছাত্রশিবিরের থানা সভাপতি থেকে শুরু করে আজ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের রুকন এবং পল্টন থানার ইউনিট সভাপতি হিসেবে সংগঠন আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে তা সততার সাথে পালন করেছি। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের অবহেলিত মানুষের করুণ চিত্র আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। দল যদি আমার অতীত ত্যাগ, অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের আকুল আকাঙ্ক্ষাকে বিবেচনা করে ১নং বুকাবুনিয়া ইউনিয়নে আমাকে দলের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়, তবে সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত, আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও যুগোপযোগী মডেল ইউনিয়ন উপহার দিতে আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।”
৩. রাজপথের লড়াকু ও ত্যাগী নেতা আলহাজ্ব মো: কবির হোসেন:
১নং বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের তৃণমূল রাজনীতিতে সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখগুলোর একটি হলো আলহাজ্ব মো: কবির হোসেন। তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং বুকাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক জনপ্রিয় চেয়ারম্যান প্রার্থী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। বর্তমানে তিনি পল্টন জামায়াতে ইসলামীর ১নং ইউনিটের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনআমলে তিনি বহুবার রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তবুও মাঠ ছেড়ে যাননি। সাধারণ মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর কারণে ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে গ্রামে তাঁর একটি বড় ধরণের জনভিত্তি ও নিজস্ব কর্মী সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে।
আলহাজ্ব মো: কবির হোসেনের মূল অগ্রাধিকার হলো অবহেলিত গ্রামীণ অবকাঠামোর সংস্কার। বিশেষ করে বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, কাঁচা পোল-কালভার্ট পুনর্নির্মাণ, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের মাঝে সরকারি ভাতা, ত্রাণ ও সুবিধা শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে বণ্টন করা। তিনি স্বজনপ্রীতি ও ঘুষমুক্ত ইউনিয়ন পরিষদ গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা করছেন।
নিজের প্রার্থী হওয়া ও রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আলহাজ্ব মো: কবির হোসেন বলেন, “আমি সংগঠনের একজন অত্যন্ত একনিষ্ঠ ও ত্যাগী কর্মী। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে চরম রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে আমাকে। ভুয়া মামলা, রাজনৈতিক হামলা, ঘরবাড়ি ছাড়া হওয়া এমনকি জেল-জুলুম সহ্য করেও আমি কখনো কোনো লোভ-লালসার কাছে মাথানত করিনি। আমি ইতিপূর্বেও বুকাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এলাকার প্রতিটি অলিগলি এবং প্রতিটি সাধারণ পরিবারের সাথে আমার আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। আমার এই দীর্ঘদিনের ত্যাগ, সামাজিক কাজ এবং মাঠপর্যায়ের প্রগাঢ় জনসমর্থন বিবেচনা করে দল যদি আমাকে ১নং বুকাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থীরূপে মনোনীত করে, তবে ইনশাআল্লাহ অবহেলিত বুকাবুনিয়াকে একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক ও সত্যিকারের গণমুখী মডেলে পরিণত করতে আমি নির্বাচনের মাঠে চূড়ান্ত লড়াই করব।”
বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য এই তিন প্রার্থীর প্রত্যেকেই নিজ নিজ গুণাবলীতে অনন্য। যেখানে একদিকে রয়েছে মাওলানা মাহবুবুর রহমানের নীতি-নৈতিকতা ও প্রবীণ শিক্ষক হিসেবে অপরিসীম শ্রদ্ধা, অন্যদিকে আবুল কালাম আজাদের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব ও আধুনিকায়নের ভাবনা, এবং আলহাজ্ব মো: কবির হোসেনের দীর্ঘদিনের সামাজিক ত্যাগের অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততা।
স্থানীয় ভোটাররা মনে করছেন, এই তিন নেতার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বুকাবুনিয়া ইউনিয়নকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর হাইকমান্ড তৃণমূলের মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক সমীকরণ হিসাব করে কার হাতে চূড়ান্ত মনোনয়ন তুলে দেয়, সেটির দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন ১নং বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের সর্বস্তরের ভোটার ও দলটির হাজারো নেতাকর্মী।


আপনার মতামত লিখুন