যেখানে মানুষ জাগে, সেখানেই কমরেড মনি সিং
চন্দন কুমার লাহিড়ী:
কমরেড মনি সিং জন্মেছিলেন ইতিহাসের এক অসম ভূখণ্ডে—যেখানে মানুষ ছিল, কিন্তু মানুষের অধিকার ছিল না। সেই বাস্তবতা তাঁকে শেখায়, মুক্তি ভিক্ষা নয়, মুক্তি সংগ্রামের ফল। তাই তিনি ঘর ছাড়লেন, সংসার ত্যাগ করলেন, রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে দাঁড়ালেন মানুষের পাশে। ব্যক্তিগত স্বর্গ তাঁর সামনে হাতছানি দিয়েছিল—ক্ষমতা, স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা—সবই তাঁর নাগালে ছিল। কিন্তু তিনি জানতেন, যে স্বর্গ কেবল একার, তা আসলে আরেক রকম নরক। তাই ভোগের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বেছে নিলেন ত্যাগের রাজনীতি, শ্রেণিসংগ্রামের অগ্নিপথ। তিনি পথে নামলেন—একজন ভবঘুরে বিপ্লবীর মতো, এক হাতে স্বপ্ন, অন্য হাতে ইতিহাস। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো তাঁর ডাক ছিল নীরব কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এলো শ্রমিক, কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ—যারা এতদিন ইতিহাসের পাদটীকায় বন্দি ছিল। বাধা এসেছে রাষ্ট্রের কাছ থেকে, বিপত্তি এসেছে ক্ষমতার কাছ থেকে, কারাগার এসেছে শাসনের হাতিয়ার হয়ে—তবু স্বপ্নের পথে যাত্রা থামেনি। কারণ যেখানে মানুষ জাগে, সেখানে শিকল টেকে না।
মনি সিং নিজে স্বপ্নমগ্ন ছিলেন না শুধু—তিনি স্বপ্নকে রাজনৈতিক চেতনায় রূপ দিয়েছিলেন। সেই চেতনা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের আনাচে-কানাচে, দাবানলের মতো। আগুনের তাপ নেভানো যায়, কিন্তু মানুষের স্বপ্নের উত্তাপ নেভানো যায় না—কারণ সেই উত্তাপ জন্ম নেয়- ক্ষুধা থেকে, বঞ্চনা থেকে, অপমান থেকে। সেই স্বপ্নের কোনো ঠিকানা নেই, কোনো সীমানা নেই, কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই। এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের ভেতর তা প্রবাহিত হয় ইতিহাসের মতোই অবিরাম। এই স্বপ্নই রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করে, ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলে, আর মানুষকে শেখায়—স্বর্গ আকাশে নয়, স্বর্গ গড়ে তুলতে হয় এই মাটিতেই।
শ্রমিক, শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের জীবন–জীবিকার সংগ্রাম সুদূর অতীত থেকেই অবিরাম চলে আসছে। এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় মহামতি কার্ল মার্কস ও ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস তাঁদের মনন, দর্শন ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষের মুক্তির এক প্রামাণ্য দলিল নির্মাণ করেন। তাঁদের দর্শন, নিছক তত্ত্ব হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে শোষিত মানুষের হাতে সংগ্রামের দিশারি। এই মানবমুক্তির দর্শনকে হাতিয়ার করে বিপ্লবীরা যুগে যুগে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার প্রত্যয়ে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। সেই মনন ও দর্শনের উত্তরাধিকার বহন করেই কমরেড মনি সিং অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেন—নিজে পথ চলার পাশাপাশি হয়ে ওঠেন পথপ্রদর্শক। মানুষের মুক্তির যে সংগ্রাম তিনি ধারণ করেছিলেন, তা আজও অব্যাহত; সময় বদলালেও সংগ্রামের প্রয়োজন ও তাৎপর্য আজও অম্লান। যুগে যুগে মানবসভ্যতার ইতিহাসে জন্মগ্রহণ করেছেন মহান বিপ্লবীরা—যাঁরা ব্যক্তিগত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করে জীবনভর সংগ্রাম করেছেন মানুষের মুক্তির জন্য। ইতিহাসের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাঁরা বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেদের জীবন, এগিয়ে গেছেন এমন এক পৃথিবী নির্মাণের সংগ্রামে যেখানে ক্ষুধা, অনাহার ও দারিদ্র্যের অবসান ঘটবে, আর মানুষের মুক্তিই হবে চিরন্তন মূল কথা। এই ধারাবাহিকতায় ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো—কিউবান বিপ্লবের নেতা ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রনায়ক; আর্নেস্তো ‘চে’ গুয়েভারা—বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতীক; মাও সেতুং—চীনা বিপ্লবের প্রধান স্থপতি; হো চি মিন—ভিয়েতনামের স্বাধীনতা ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রূপকার; কিম ইল সুং—জুচে মতাদর্শের প্রবর্তক; সালভাদোর আয়েন্দে—গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট; দানিয়েল অর্তেগা—সান্দিনিস্তা বিপ্লবের নেতা; কার্লোস মারিগেলা—ব্রাজিলের বিপ্লবী তাত্ত্বিক ও গেরিলা সংগ্রামের পথিকৃৎ। ঠিক তেমনই, আমাদের এই ভূখণ্ডের বিপ্লবী স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন/থাকবেন কমরেড মনি সিং।
ভিন্ন ভাবনায় দেখলে লোভ, লালসা, দুঃখ ও যন্ত্রণার বন্ধন থেকে মুক্তির যে পথ মহামতি গৌতম বুদ্ধ মানবজাতিকে দেখিয়েছিলেন, কমরেড মনি সিংয়ের জীবনযাপনেও তার এক গভীর প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন সংসার-ত্যাগী, সকল প্রকার ভোগবাদী আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে আত্মনিবেদিত এক বিপ্লবী। যেমন এক ভরা পূর্ণিমার রাতে গৌতম বুদ্ধ মায়ার টান ছিন্ন করে গৃহত্যাগ করেছিলেন—ত্যাগ করেছিলেন রাজপ্রাসাদ, সংসার, পুত্র ও ঐশ্বর্যে মোড়া স্বপ্নপুরী—ঠিক তেমনই কমরেড মনি সিংও সচেতনভাবে ব্যক্তিগত জীবনের মোহ কাটিয়ে মানুষের মুক্তির পথ অনুসন্ধানে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। দুঃখময়, বিষাদে ভরা পৃথিবীর মানুষের মুক্তির বাসনায় বুদ্ধ যেমন ভিক্ষুকের বেশে পথে নেমেছিলেন, তেমনি কমরেড মনি সিংও শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বেছে নিয়েছিলেন নিরলস সংগ্রামের জীবন।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেভাবে লিখেছেন—
“এরে ভিখারি সাজায়ে কী রঙ্গ তুমি করিলে,
হাসিতে আকাশ ভরিলে”—
এই পংক্তির মধ্যেই যেন ধরা পড়ে সেই মহান ত্যাগের সৌন্দর্য। মানুষের কষ্ট ও দুঃখ লাঘবের আকাঙ্ক্ষায় বুদ্ধ যেমন এক আশ্চর্য সাধনায়, ধ্যানমগ্নতার গভীরে নিমগ্ন হয়েছিলেন, তেমনি বিপ্লবীর সাধনা ছিল চিন্তার গভীরতায়, যুক্তির ধারালো অস্ত্রে ও প্রশ্নের নির্ভীক চর্চায়।
বৌদ্ধ সংঘে যেমন ভিক্ষুরা একত্রে বসবাস করতেন—কেউ ধ্যানে নিমগ্ন, কেউ ধর্মচর্চায় নিবিষ্ট, কেউ আবার অন্যকে মুক্তির পথ দেখাতেন—ঠিক তেমনই কমিউনিস্ট পার্টিও গড়ে উঠেছিল এক ভিন্নতর সংঘ হিসেবে। এখানে ধ্যানের জায়গায় ছিল চিন্তার গভীরতা, জপের জায়গায় ছিল যুক্তি ও প্রশ্ন, আর নির্বাণের আকাঙ্ক্ষার জায়গায় ছিল শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। এই সংঘের এক নীরব কিন্তু অটল ও শক্ত স্তম্ভ ছিলেন কমরেড মনি সিং। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি শাসনকাল এবং স্বাধীন বাংলাদেশ—প্রতিটি সংগ্রাম ও লড়াইয়ে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে তিনি পার্টিকে সমৃদ্ধ করেছেন। জেল-জুলুম, হুলিয়া ও নির্যাতন তাঁর সংগ্রামের পথে বিন্দুমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বিশ্বাস ও ভালবাসায় (নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে) তিনি সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ, সংগ্রামমুখর ও মহিমান্বিত জীবন অতিক্রম করে ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর কমরেড মনি সিং মৃত্যুবরণ করেন; কিন্তু তাঁর আদর্শ, ত্যাগ ও সংগ্রাম আজও মানুষের মুক্তির পথে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলছে।
দুর্গাপুর, নেত্রকোণা জেলার একটি উপজেলা। দুর্গাপুরের প্রকৃত সৌন্দর্য তার ভূগোলে নয়—তার প্রাণে, আর সেই প্রাণের নাম স্বচ্ছ সোমেশ্বরী নদী। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের অভ্যন্তরে সীমসাংগ্রী বা সমসাংগা নামক স্থান থেকে উৎপন্ন হয়ে সোমেশ্বরী নদী বাঘমারা বাজারের পাশ দিয়ে দুর্গাপুরে প্রবেশ করেছে। দুর্গাপুরের বুক চিরে, তার পাশ ঘেঁষেই বয়ে গেছে এই অপূর্ব সুন্দর নদী। কলকাতা শহরে জন্ম হলেও শৈশব থেকে এখানেই বেড়ে উঠেছেন কমরেড মনি সিং । ফলে পাহাড়ঘেরা সোমেশ্বরী নদীর পাড়ের মানুষ আর মানুষের মন—দুটোই তাঁর ভেতরে এক অনন্য, মোহময় বিস্তার নিয়ে গড়ে উঠেছে। নদীর মতোই এই মানুষগুলো—কখনো উথাল-পাথাল, কখনো উদ্দাম, আবার কখনো মায়াবী কোমলতায় নীরব; অথচ বিশ্বাসে দৃঢ় ও অবিচল। সোমেশ্বরী নদী কোমল, স্বচ্ছ। তার তলদেশে বালিকণার নীরব ঝিলিক। কখনো সে বান ডাকে, একূল ভেঙে পড়ে, আবার অন্য কূলে গড়ে তোলে নতুন স্বপ্ন, আশা। জনজীবন হারায় না—শুধু স্থান বদলায়। নদীর পাড় আঁকড়ে ধরে মানুষ বাঁচে, স্বপ্ন দেখে; বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাই নদী আর মানুষের আত্মার এই মিলন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবিরাম বয়ে চলে। ঠিক সেই নদীর মতোই কমরেড মনি সিংয়ের সঙ্গে আমাদের প্রেম, ভালোবাসা ও আদর্শের এক গভীর মেলবন্ধন। কমরেড মনি সিং ছিলেন আমাদের সোমেশ্বরীর মতোই—বিশ্বাসী, কঠিন, উদার; নিঃশব্দ অথচ গভীরভাবে স্বচ্ছ। তিনি প্রবাহমান ছিলেন মানুষের জীবনের ভেতর দিয়ে, সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। আজও আমরা হাঁটি তাঁর দেখানো সেই মায়াবী স্বপ্নের পথ ধরে—মানুষের মুক্তির সংগ্রামের পথে। যে পথে নদী কথা বলে, আর মানুষ বাঁচে প্রবল আশার বিশ্বাসে; শ্রেণীহীন, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয়ে। কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর পাড়ে জন্ম নেওয়া মরমী সাধক ফকির লালন শাহ যেমন লোকায়ত জীবনে ভাবাদর্শের এক প্রবল বান ডেকেছিলেন, তেমনি নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা কমরেড মনি সিং মানুষের মুক্তির সংগ্রামের পথিকৃত হয়ে উঠেছিলেন। একজন আত্মার মুক্তির কথা বলেছিলেন, আরেকজন বলেছিলেন সমাজের মুক্তির কথা। সেই দুই ধারাই আজও আমাদের সাহস জোগায়, পথ দেখায়, এবং সংগ্রামে অবিচল থাকতে প্রেরণা দেয়।
মনে রাখতে হবে, ২০২৫ সালের শেষেও আমরা যারা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সঙ্গে যুক্ত, আমরা এক মহান অতীত সংগ্রামের পথ ধরে অবিরাম এগিয়ে চলছি। সেই পথেই নিহিত আমাদের মুক্তির বার্তা, সেই পথেই জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা। অতীতকে ভুলে গেলে আমরা পথ হারাবো; অতীতকে স্মরণ করলে আমরা শক্তিশালী হয়ে উঠবো, সংগ্রামের অগ্নিপথে আরও দৃঢ়ভাবে হাঁটতে পারবো।
লেখক পরিচিতি: মুক্ত সাংবাদিক ও অধিকার কর্মী।
Email: Laherichandan@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন