রোগী হারানোর শোক, ঋণের বোঝা নয়: সময় এসেছে মানবিক নীতিমালার
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের শেষ ভরসা হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হন। প্রিয়জনকে বাঁচানোর আশায় অনেক পরিবার তাদের সঞ্চয় শেষ করে, ঋণ নেয়, এমনকি জমিজমাও বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করে। কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে যখন রোগী মৃত্যুবরণ করেন, তখন শোকের পাশাপাশি পরিবারকে বহন করতে হয় বিশাল অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মনে হয়, এ বিষয়ে সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। আমি মনে করি, চিকিৎসাধীন অবস্থায় কোনো রোগী মৃত্যুবরণ করলে অন্তত দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় মওকুফের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। প্রয়োজনে সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সমাজের বিত্তবানদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন করা যেতে পারে।
আমরা প্রায়ই দেখি, স্বজন হারানোর বেদনার মধ্যেও অনেক পরিবার হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ে। কারও মাথার ওপর চেপে বসে ঋণের বোঝা, কারও ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। একটি মানবিক রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
তবে এটাও সত্য যে, সব রোগীর মৃত্যু চিকিৎসকের ভুল বা অবহেলার কারণে ঘটে না। অনেক রোগী জটিল ও সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন এবং চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয় না। তাই এই প্রস্তাবকে কোনো চিকিৎসক বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে নয়, বরং শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর একটি মানবিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং ব্যয়ের হিসাব রোগীর স্বজনদের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
মানুষ যখন হাসপাতালে যায়, তখন সে শুধু চিকিৎসা নয়, মানবিক আচরণও প্রত্যাশা করে। তাই প্রিয়জন হারানোর শোকের মুহূর্তে যেন কোনো পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।
উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে স্বাস্থ্যসেবাকেও হতে হবে আরও সহানুভূতিশীল। কারণ, একজন নাগরিকের সবচেয়ে কঠিন সময়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তার পাশে দাঁড়ানো। রোগী হারানোর বেদনা যেন আর ঋণের বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়—এটাই হোক আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।
লেখক: জিয়াউল হক সজীব
নিজস্ব প্রতিনিধি, চরফ্যাশন।


আপনার মতামত লিখুন