মায়ের দোয়া মাথায় নিয়ে জাপানের পথে সৃজন গোল্ডেন জিপিএ-৫ থেকে জাপানের মেক্সট স্কলারশিপ—এক মায়ের ত্যাগ, পরিবারের স্বপ্ন ও এক মেধাবী তরুণের সাফল্যের গল্প
বিশেষ প্রতিবেদন:
রাত তখন ২টা ২৫ মিনিট। চারপাশে গভীর নীরবতা, অথচ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদায়ের ব্যস্ততা ও আবেগঘন পরিবেশ। স্বজনদের চোখে আনন্দ, গর্ব এবং বিচ্ছেদের অশ্রু। বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে চড়ে জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের পথে যাত্রা করেন মেধাবী তরুণ এস এম শাহরিয়ার আহমেদ সৃজন। তাঁর গন্তব্য জাপান, লক্ষ্য উচ্চতর শিক্ষা। সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পাশাপাশি বাবা-মায়ের দোয়া, পরিবারের ভালোবাসা, শৈশব-কৈশোরের অসংখ্য স্মৃতি এবং অর্জিত জ্ঞান দিয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার।
জাপানের স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটি অব তোয়ামায় (University of Toyama) উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য দেশটির মর্যাদাপূর্ণ শতভাগ অর্থায়িত মেক্সট স্কলারশিপ (MEXT Scholarship) অর্জন করেছেন সৃজন। তাঁর এই অর্জন শুধু একটি আন্তর্জাতিক বৃত্তি লাভের ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা, কঠোর অধ্যবসায়, পরিবারের সীমাহীন ত্যাগ, একজন মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও দোয়া এবং স্বপ্নপূরণে এক তরুণের নিরন্তর সাধনা। সৃজনের এই সাফল্যে পরিবার ও স্বজনদের পাশাপাশি আনন্দিত তাঁর শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই মেধা ও সাফল্যের পরিচয় দিয়ে আসছেন সৃজন। ২০১৪ সালে এ কে স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি। এরপর ২০১৬ সালে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায়ও গোল্ডেন জিপিএ-৫ পান। ধারাবাহিক সাফল্যের পথ ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে স্নাতক এবং ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি অর্জনের পেছনে ছিল নিয়মিত অধ্যয়ন, আত্মবিশ্বাস, নিয়মানুবর্তিতা এবং প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা। এবার সেই শিক্ষাযাত্রাই তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে জাপানের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষাঙ্গনে।
তবে সৃজনের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি আলো ছড়ানো গল্পটি তাঁর মা শাহানাজ আক্তারের। সন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তাঁকে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি। পরিবারের স্মৃতিতে আজও অমলিন রয়েছে একটি পরিচিত দৃশ্য—সৃজন বাইরে যাওয়ার জন্য দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন, আর মা ঘর থেকে ডাকছেন। মায়ের ডাকে ‘আম্মু’ বলে সাড়া দেওয়া এবং তাঁর দোয়া ও আশীর্বাদ নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া ছিল সৃজনের নিত্যদিনের অভ্যাস। সন্তানের নিরাপত্তা, সুস্থতা ও সাফল্যের জন্য মায়ের সেই ব্যাকুলতা হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে লেখা থাকে না; কিন্তু জীবনের কঠিন পরীক্ষায় এই শিক্ষা ও দোয়াই একজন মানুষকে সাহস, শক্তি এবং সঠিক পথে থাকার অনুপ্রেরণা দেয়।
সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার পাশাপাশি বয়স বাড়লেও নিজের জ্ঞানার্জনের পথ থেকে সরে যাননি শাহানাজ আক্তার। তিনি এখনও একটি মহিলা মাদ্রাসায় নিয়মিত পড়াশোনা করছেন। সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব পালনের মধ্যেও শিক্ষার প্রতি তাঁর এই আগ্রহ পরিবারে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। একজন মা নিজে জ্ঞানের পথে থাকলে তাঁর সন্তানদের মধ্যেও শিক্ষা, নৈতিকতা ও আত্মোন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা গভীরভাবে প্রোথিত হয়—সৃজনের জীবন যেন তারই বাস্তব প্রতিফলন। মায়ের এই সাধনা ও মানসিকতাই সৃজনের জীবনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে শাহানাজ আক্তার অনেক সময় নিজের প্রয়োজন, আরাম এবং খাওয়া-দাওয়ার কথাও ভুলে যেতেন। সন্তানের পড়াশোনা, সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ নিয়েই ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক ভাবনা। সন্তান ভালো থাকলে এবং তার মুখে হাসি ফুটলে সেটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একজন মা সন্তানের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, কত নির্ঘুম রাত কাটাতে পারেন এবং নিজের স্বপ্নকে সন্তানের স্বপ্নের সঙ্গে একাকার করে দিতে পারেন—সৃজনের পরিবার সেই চিরন্তন মাতৃত্বের এক আবেগঘন উদাহরণ। ইসলামী জীবনব্যবস্থায় সন্তানের জন্য মায়ের দোয়া ও সন্তুষ্টির যে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, সৃজনের পথচলা যেন তারই একটি মানবিক প্রতিচ্ছবি।
সৃজনের সঙ্গে তাঁর একমাত্র ছোট বোন সানজিদা আক্তার সামিরার সম্পর্কও গভীর ভালোবাসা ও মমতায় গড়া। পরিবারের সদস্যরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, সৃজন যতই ভাত খেতেন না কেন, ছোট বোনের হাত থেকে একমুঠো ভাত না খেলে যেন তাঁর খাওয়া পূর্ণ হতো না। ঘটনাটি শুনতে খুব সাধারণ ও ছোট মনে হলেও ভাই-বোনের ভালোবাসার কাছে সেই একমুঠো ভাতই হয়ে উঠেছে আজীবনের এক অমূল্য স্মৃতি। আজ সৃজন হাজার হাজার মাইল দূরে জাপানের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু ছোট বোনের হাতের সেই একমুঠো ভাত, শৈশবের খুনসুটি এবং পারিবারিক ভালোবাসার মুহূর্তগুলো নিশ্চয়ই তাঁর হৃদয়ের খুব কাছেই থাকবে।
সৃজনের বাবা এস এম শাহ্ জালাল সাইফুল একজন গণমাধ্যমকর্মী। দাউদকান্দির জুয়ানপুরের পারিবারিক শিকড় থেকে উঠে এসে শিক্ষা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পরিবেশে সন্তানদের গড়ে তুলেছেন তিনি। একজন গণমাধ্যমকর্মী বাবার জন্য সন্তানের এমন আন্তর্জাতিক অর্জন নিঃসন্দেহে গভীর আনন্দ ও গর্বের। কলমের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের কথা বলা বাবার সন্তান আজ উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের জন্য দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে পা রাখছেন। একই পরিবারের দুই প্রজন্মের পথ আলাদা হলেও তাঁদের লক্ষ্য যেন অভিন্ন—জ্ঞান, সততা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে সমাজে আলো ছড়ানো।
শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া এই পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে এগিয়ে চলেছেন। সৃজনের একমাত্র বোন সানজিদা আক্তার সামিরা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত। তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান লিয়াও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করে কর্মজীবনে যুক্ত রয়েছেন। ফলে পরিবারটির প্রতিটি প্রজন্মের গল্পেই শিক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং নিজের অবস্থান থেকে দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করার প্রত্যয় গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
সৃজনের পারিবারিক শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের গৌরবময় ইতিহাস। তাঁর বড় জ্যাঠা বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) হাজী মো. নজরুল ইসলাম সরকার। তাঁর জীবন, ত্যাগ ও দেশপ্রেম পরিবারের নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ এমন একটি পরিবারে বেড়ে ওঠায় সৃজনের মধ্যেও দেশ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হয়েছে। বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একদিন দেশের কল্যাণে কাজে লাগাবেন—পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের এটাই প্রত্যাশা।
পূর্ব শেখদী, যাত্রাবাড়ীর বড় খালা মমতাজ বেগমের কাছ থেকেও ছোটবেলা থেকে সৃজন পেয়েছেন অকৃত্রিম স্নেহ, ভালোবাসা ও আশ্রয়। ছোট খালা তাসলিমা বেগমের কোনো ছেলে সন্তান না থাকলেও তিনি সৃজনকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসেন। মামা-খালাসহ পরিবারের সব সদস্যের আদর, দোয়া ও ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা এই তরুণের জাপানযাত্রায় তাই আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে বিচ্ছেদের গভীর আবেগ। একজন সন্তানের বিদেশযাত্রা শুধু বাবা-মায়ের জন্য নয়, পুরো পরিবারের জন্যই একদিকে গর্বের, অন্যদিকে শূন্যতার অনুভূতি নিয়ে আসে।
একটি সন্তান যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়, তখন বিমানবন্দরের বিদায় মুহূর্তে শুধু একজন শিক্ষার্থী দেশ ছাড়েন না; তাঁর সঙ্গে যেন একটি মায়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, একজন বাবার সংগ্রাম এবং একটি পরিবারের প্রত্যাশাও আকাশে ডানা মেলে। সৃজনের গল্প তাই শুধু মেধা কিংবা বৃত্তি অর্জনের গল্প নয়। এটি একজন মায়ের দোয়া ও আত্মত্যাগের গল্প, একজন বাবার প্রেরণা ও মূল্যবোধের গল্প, ছোট বোনের নিখাদ ভালোবাসার গল্প এবং পরিবারের সম্মিলিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প। সবচেয়ে বড় কথা, এটি শিক্ষাকে জীবনের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে ধাপে ধাপে সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
প্রবাদে বলা হয়, ‘একজন শিক্ষিত মা একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে পারেন।’ সৃজনের জীবন ও তাঁর পরিবারের দিকে তাকালে কথাটির গভীরতা নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা, বাবার কাছ থেকে পাওয়া দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধ এবং নিজের অধ্যবসায় ও মেধাকে পুঁজি করে সৃজন আজ জাপানের পথে। তাঁর এ যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়; এটি বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণার বার্তা—লক্ষ্য স্থির রেখে পরিশ্রম করলে এবং পরিবারের দোয়া ও সমর্থন সঙ্গে থাকলে স্বপ্নের দূরত্ব একদিন অতিক্রম করা সম্ভব।
আজ সৃজন বিমানে। পেছনে পড়ে রয়েছে বাবা-মায়ের স্নেহময় ঘর, ছোট বোনের হাতের একমুঠো ভাতের স্মৃতি, মামা-খালাদের ভালোবাসা, স্ত্রী ও পরিবারের আন্তরিক সমর্থন এবং প্রিয় মাতৃভূমির পরিচিত পরিবেশ। সামনে অপেক্ষা করছে নতুন দেশ, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন সংস্কৃতি, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনায় ভরা এক নতুন জীবন। আর তাঁর মাথার ওপর ছায়া হয়ে রয়েছে একজন মায়ের দোয়া—যে দোয়া দূরদেশেও সন্তানকে সাহস দেবে, সঠিক পথে রাখবে এবং নতুন পথচলার প্রতিটি ধাপে শক্তি জোগাবে।
পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা, সৃজন উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাবেন। তাঁর সাফল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তরুণদের বড় স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন পূরণে পরিশ্রম করতে উৎসাহিত করবে। দেশের সন্তান হিসেবে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মর্যাদা উজ্জ্বল করাই হবে তাঁর অর্জনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
আল্লাহ তায়ালা সৃজনের এই জ্ঞানার্জনের সফর কবুল করুন, তাঁকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখুন, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ করুন এবং অর্জিত জ্ঞান দিয়ে দেশ, জাতি ও মানবকল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন। মায়ের দোয়া এবং সন্তানের মেধা ও অধ্যবসায়—এই দুইয়ের মিলনেই হয়তো জন্ম নেয় এমন কিছু অনন্য সাফল্যের গল্প, যা শুধু একটি পরিবারের গর্ব হয়ে থাকে না; বরং একটি সমাজ ও একটি প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার আলো হয়ে ওঠে।


আপনার মতামত লিখুন